কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এ ১০:৩৮ AM
কন্টেন্ট: পাতা
পদ্মা, মেঘনা আর কীর্তিনাশার নরম পলির এক উর্বর জনপদের নাম শরীয়তপুর। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রশাসনিক বিন্যাসের লক্ষ্যে বিদ্যমান মাদারীপুর মহকুমার পূর্বাঞ্চলের ছয়টি থানার সমন্বয়ে একটি নতুন মহকুমা স্থাপন করেন এবং এর সদরদপ্তর স্থাপিত হয় তৎকালীন পালং-এ। মাদারীপুর মহকুমার শিবচর থানার আধ্যাত্মিক পুরুষ হাজী শরীয়তুল্লাহ-এর নামানুসারে এই নতুন মহকুমার নামকরণ করা হয় শরীয়তপুর।
শরীয়তপুর মহকুমার প্রথম মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) জনাব আমিনুর রহমান। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অনুধাবন করেন যে, এত-সমৃদ্ধ এবং সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চলে কোনো উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। তরুণ মহকুমা প্রশাসক জনাব আমিনুর রহমান তৎকালে পালং অঞ্চলের গণ্যমাণ্য ব্যাক্তিদের ডেকে মতবিনিময় করেন এবং শরীয়তপুর জেলার কেন্দ্রস্থলে একটি মহাবিদ্যালয় স্থাপনের সদিচ্ছা প্রকাশ করেন।
এই প্রস্তাবে এলাকার বিদ্যোৎসাহী ব্যাক্তিবর্গের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তাঁদের অদম্য আন্তরিকতা, অক্লান্ত পরিশ্রম, অকাতর দান এবং অমলিন কর্মস্পৃহার অপূর্ব সম্মিলনে ১৯৭৮ সালের ৯ জুন যাত্রা শুরু করে শরীয়তপুর মহাবিদ্যালয়।
শরীয়তপুর মহাবিদ্যালয়ের নামকরণ নিয়েও একটি ইতিহাস আছে। প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তাদের মধ্যে কলেজের নামকরণ নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। এই অঞ্চলের একজন প্রথিতযশা শিল্পপতি প্রস্তাব করেন যে, কলেজের নাম তাঁর নামে রাখা হলে তিনি এককালীন বিপুল অঙ্কের টাকা প্রদান করবেন। মহকুমা প্রশাসন জনাব আমিনুর রহমান মত প্রকাশ করেন, যেহেতু প্রস্তাবিত মহাবিদ্যালয়টি এতদ্বঞ্চলের মানুষের প্রাণের প্রতিষ্ঠান, সেহেতু এই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ কোনো ব্যাক্তির নামে না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তিনি প্রস্তাব রাখেন, এই অঞ্চলের পুণ্যবান মহাপুরুষ হাজী শারীয়তুল্লাহ্-এর নামে মহকুমার নামকরণ করা হয়েছে। সেহেতু এই প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গেও এই পুণ্য জড়িয়ে থাকুক, কলেজ অর্গানাইজিং কমিটি সর্বসম্মতভাবে শরীয়তপুর মহকুমার নামেই কলেজের নামকরণ করেন 'শরীয়তপুর মহাবিদ্যালয়'। ১৯৮০ সালর ১ মার্চ শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কলেজটি জাতীয়করণ করেন। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয়করণকৃত কলেজের পরিবর্তিত নাম হয় 'শরীয়তপুর সরকারি কলেজ'। কলেজ প্রতিষ্ঠায় শরীয়তপুরের সর্বস্তরের জনগণের ভূমিকা রয়েছে। কেউ জমি দান করেছেন, কেউ অর্থ দিয়েছেন, কেউ কেউ অর্থ সংগ্রহে ভূমিকা রেখেছেন, কেউ শ্রম দিয়েছেন, কেউ পরামর্শ দিয়েছেন। এক কথায়, এই অঞ্চলের আপামর মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই অসংখ্য মানুষের মধ্যে কলেজ প্রতিষ্ঠায় যারা সামনের কাতারে ছিলেন, তাঁদের কারো কারো নাম না নিলেই নয়। কলেজ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন মহকুমা প্রশাসক জনাব আমিনুর রহমান। তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন তৎকালীন বিনোদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পরবর্তীকালে শরীয়তপুর-১ আসন থেকে বার বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য সরদার একেএম নাসির উদ্দিন কালু। এই দুজনের আন্তরিক প্রচেষ্টা কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত।
এর সাথে যাদের নাম না নিলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়-তাঁরা হলেন, তৎকালীন মহকুমা প্রশাসনের সেকেন্ড অফিসার জনাব আবদুল মান্নান (কলেজ অর্গানাইজিং কমিটির সম্পাদক), মহকুমা পুলিশ প্রশাসক জনাব আব্দুর রউফ, জনাব ইয়াকুব আলী হাওলাদার (আংগারিয়া), মুন্সি আজিজুল হক (চরআত্রা), রবীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী (বালুচরা), একেএম নুরুল ইসলাম চৌধুরী (প্রধান শিক্ষক, পিটিজিডি হাইস্কুল), আমজাদ হোসেন সরদার (ডিএমখালি), রামকৃষ্ণ দাস পোদ্দার (ধানুকা), আলহাজ্ব আব্দুল করিম (মনাই) দেওয়ান (মূলফৎগঞ্জ), ওমর আলী সরদার (ছয়গাঁও), আলহাজ্ব লাল শরীফ (ভেদরগঞ্জ), এসকান্দার আলী ফরাজী (চিতলিয়া), আব্দুর রহমান খান (আংগারিয়া), বিরাজ কান্দি দত্ত (পালং), আলহাজ্ব ওয়াজ উদ্দিন মোল্লা (আংগারিয়া), আব্দুল মজিদ মাঝি (পালং), আবুল হাসেম মাদবর (স্বর্ণঘোষ), আব্দুল ওয়াহেদ বেপারী (তুলাসার), আব্দুল কাদের ঢালী (হুগলি), আবুল কাশেম কোতোয়াল (হুগলি), আলী আজম শিকদার (পালং), মোঃ রফিকউল্লাহ (মহকুমা সমবায় অফিসার), গোলাম মহিউদ্দিন (সি.ও রাজস্ব), আব্দুল মান্নান (সি.ও উন্নয়ন), আবুল কাসেম আলী খলিফা (সাব-রেজিস্টার), অধ্যাপক মোঃ ওসমান খান, অধ্যাপক মোঃ আলী হোসেন, আব্দুল মোতালেব বেপারী (আংগারিয়া), মোঃ নয়ান খান (চন্দ্রপুর), মুন্সি মতিউর রহমান (বুড়িরহাট), প্রদ্যুৎ কুমার দত্ত (এসডিও অফিস) এছাড়া আরো অগণিত মানুষ শরীয়তপুর মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছেন।
শরীয়তপুর সরাকারি কলেজ শরীয়তপুর জেলা সদরে অবস্থিত প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী কলেজ। শরীয়তপুর-মাদারীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে শরীয়তপুর পৌরসভার কেন্দ্রস্থল ঐতিহাসিক ধানুকায় এর অবস্থান
শরীয়তপুর সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠাকালীন শুধু উচ্চমাধ্যামিক পর্যায়ে পাঠদান করা হতো। ১৯৮৮-৮৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে এই কলেজে স্নাতক (পাস) বিএ ও বিকম পর্যায়ে পাঠদান শুরু হয়। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে বিএসএস ও বিএসসি পাঠদানে অনুমতি প্রাপ্ত হয়। ১৯৯৮-৯৯ শিক্ষাবর্ষে শরীয়তপুর সরকারি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগে অনার্স কোর্স চালু করা হয়। অনার্স কোর্স চালু করার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অধিভুক্তি প্রাপ্তিতে দিকনির্দেশনা ও সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন বিষয়বিশেষজ্ঞ ও মাাদরীপুর নাজিম উদ্দিন কলেজের (বর্তমান মাাদারীপুর সরকারি কলেজ) প্রাক্তন অধ্যক্ষ জনাব আমজাদ আলী খান। সার্বিক কার্যক্রমে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন প্রভাষক জনাব মোঃ ফজলুল হক (বর্তমান অধ্যক্ষ)।
শরীয়তপুর সরকারি কলেজ নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ ঐতিহ্যবাহী এক আলোকিত বাতিঘরে পরিণত হয়েছে। শিক্ষায়, গৌরবে, আকারে, অবয়বে শরীয়তপুর সরকারি কলেজ আজ জেলার শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
(তথ্য সূত্র: কলেজে রক্ষিত পুরাতন রেকর্ড পত্র)